বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনামঃ
Logo সার সংকট নেই, মন্ত্রীর দাবি, মাঠে উল্টো চিত্র, সার নিয়ে হযবরল অবস্থা, সড়ক অবরোধে কৃষক Logo বেনাপোলে পুলিশের বিশেষ অভিযানে ওয়ারেন্টভুক্ত দুই আসামি গ্রেপ্তার Logo গফরগাঁও পৌরসভার নিরাপত্তায় ২৪ ঘন্টা সিসিটিভি মনিটরিং চালু Logo বকশীগঞ্জের রাজনীতিতে সাবেক মেয়র নজরুলকে ঘিরে চলছে আলোচনা Logo সাংবাদিকের ওপর হামলার প্রতিবাদে চট্টগ্রামে মানববন্ধন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি Logo ডাঃ শফিকুরের প্রশ্ন, মেয়রের জবাব Logo জনবান্ধব ইউনিয়ন গড়ে তোলাই হবে আমার প্রধান লক্ষ্য-বিএনপি নেতা আনিসুর রহমান Logo খানসামায় শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উপলক্ষে বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত Logo সাপাহারে শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উপলক্ষে মঙ্গল শোভাযাত্রা Logo ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকীতে ক্যাপ্টেন (অব.) ডা. এম. এন. সাফাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ
বিজ্ঞাপন
আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন ।  যোগাযোগঃ 01977306839

সার সংকট নেই, মন্ত্রীর দাবি, মাঠে উল্টো চিত্র, সার নিয়ে হযবরল অবস্থা, সড়ক অবরোধে কৃষক

 বিশেষ প্রতিনিধি / ১ Time View
Update : বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:৫৬ পূর্বাহ্ণ

 গুদামে ১৩ লাখ টন মজুতের দাবি, বন্দরে-পাইপলাইনে আরও ৪ লাখ ৪২ হাজার ৮০০ টন; অথচ সার না পেয়ে সড়কে কৃষক, চাহিদা, আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। আমন মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় সার না পাওয়ার অভিযোগে কৃষকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও ক্ষোভ ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। কোথাও ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও সার মিলছে না, কোথাও ডিলার পয়েন্টে দীর্ঘ অপেক্ষার পর খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে কৃষকদের। অথচ জাতীয় সংসদে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, দেশে সারের কোনো সংকট নেই; বরং পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। সরকারের মজুতের হিসাব আর মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র, এই দুইয়ের মধ্যে তৈরি হওয়া ব্যবধানই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ৫ সেপ্টেম্বর সকালে ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার গাড়াগঞ্জ বাজারে সার না পেয়ে গাছের গুঁড়ি ফেলে গাড়াগঞ্জ-শৈলকুপা আঞ্চলিক সড়ক অবরোধ করেন কৃষকরা। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, তারা ভোর থেকেই ডিলার পয়েন্টে সার নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু সকাল ১০টার দিকে ডিলার শুভ এন্টারপ্রাইজের কর্মচারীরা সার দেওয়া হবে না বলে জানালে কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তারা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। প্রায় এক ঘণ্টা অবরোধ চলার পর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও পুলিশের আশ্বাস এবং সার বিতরণ শুরু হলে কৃষকরা অবরোধ তুলে নেন। তবে ঘটনাটি শুধু একটি এলাকার বিচ্ছিন্ন সমস্যা কি না, সেটিই এখন আলোচনার বিষয়। এর আগে ২ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার সোনাহাট বাজারে সোনাহাট স্থলবন্দর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন কৃষকরা। কৃষকদের অভিযোগ, আমন চাষের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ডিলার পয়েন্টে এসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তারা প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছিলেন না। এতে কৃষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষোভ গড়ায় সড়ক অবরোধে। আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলায় পর্যাপ্ত সারের দাবিতে বুড়িমারী-লালমনিরহাট মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন কৃষকরা। আমন ধান রোপণের পর জমিতে প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগের সময় সংকট দেখা দেওয়ায় কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। ফলে সারের দাবিতে মহাসড়কে নামতে বাধ্য হন তারা। অর্থাৎ ঝিনাইদহ, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট, তিন ভিন্ন জেলার ঘটনায় একটি অভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে: কৃষকের প্রয়োজনের সময়ে ডিলার পর্যায়ে সার পাওয়া যাচ্ছে না। জাতীয় সংসদে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, দেশে সারের কোনো সংকট নেই এবং পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তিনি বলেন, গত বছর একই সময়ে দেশে সারের মজুত ছিল প্রায় ১২ লাখ টন। বর্তমানে সরকারি গোডাউনে প্রায় ১৩ লাখ টন সার মজুত রয়েছে। এর বাইরে বন্দরে কিংবা জাহাজে পাইপলাইনে রয়েছে আরও প্রায় ৪ লাখ ৪২ হাজার ৮০০ টন। মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে সারের মোট চাহিদা ৪০ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টন। তার বক্তব্যের সারকথা, মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশে সারের সংকট হওয়ার কথা নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি পর্যাপ্ত সার থাকে, তাহলে কৃষককে সার পেতে কেন ভোর থেকে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। এখানেই সামনে আসছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, গত বছরের সঙ্গে চলতি বছরের সারের চাহিদার হিসাবের পার্থক্য। উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রধান রাসায়নিক সারের মোট চাহিদা ছিল প্রায় ৫৯ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে, ইউরিয়া: ২৬ লাখ মেট্রিক টন, ডিএপি: ১৫.২ লাখ মেট্রিক টন,  এমওপি: ১০.১ লাখ মেট্রিক টন,  টিএসপি: ৭.৬৫ লাখ মেট্রিক টন। অন্যদিকে চলতি বছরে কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে বছরে সারের মোট চাহিদা ৪০ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ দুটি হিসাব পাশাপাশি রাখলে গত বছরের প্রায় ৫৯ লাখ টনের তুলনায় চলতি বছরের চাহিদা দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৪০ লাখ ২৯ হাজার টন, যা প্রায় ১৮ লাখ ৭১ হাজার টন কম। এখানেই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে: চাহিদা নির্ধারণের পদ্ধতিতে কি পরিবর্তন এসেছে? কোন কোন সারকে চলতি বছরের ৪০ লাখ ২৯ হাজার টনের হিসাবের মধ্যে ধরা হয়েছে? গত বছরের প্রায় ৫৯ লাখ টনের হিসাবের সঙ্গে চলতি বছরের হিসাবটি কি একই ভিত্তিতে করা হয়েছে? এই প্রশ্নগুলোর পরিষ্কার ব্যাখ্যা না পাওয়া পর্যন্ত শুধু মজুতের পরিমাণ দেখিয়ে সার সংকট নেই, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। বন্দরে সার আছে, কিন্তু কৃষকের হাতে পৌঁছাবে কবে? সারের সংকট বিশ্লেষণে শুধু মোট মজুতের পরিমাণ দেখলেই হবে না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সার কোথায় আছে এবং কৃষকের হাতে পৌঁছাতে কত সময় লাগবে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সেপ্টেম্বর মাসের বার্থিং পজিশন-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, বন্দরের বহিঃনোঙরে সারবাহী দুটি জাহাজ আসার তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে একটি জাহাজে কানাডা থেকে প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন এমওপি এবং অন্যটিতে রাশিয়া থেকে প্রায় ৩৫ হাজার মেট্রিক টন এমওপি আসার কথা রয়েছে। অর্থাৎ আমদানির জাহাজ থাকলেও প্রশ্ন থেকে যায়, জাহাজ থেকে সার খালাস, ব্যাগিং, পরিবহন এবং শেষ পর্যন্ত বিএডিসির গুদামে পৌঁছানোর পুরো প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত হচ্ছে? মরক্কোর সার আমদানিতেও সময়ের বড় হিসাব চলতি সেপ্টেম্বরের ১ থেকে ৯ তারিখের মধ্যে মরক্কো থেকে সার আমদানির জন্য ছয়টি লটের টেন্ডার আহ্বানের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে তিনটি জাহাজে টিএসপি এবং দুটি জাহাজে ডিএপি আমদানির কথা রয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত লে-ক্যান সময় শেষের দিকে চলে এলেও সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, মাত্র একটি জাহাজ লোড পয়েন্টে পৌঁছেছে; বাকি চারটি জাহাজ এখনো পৌঁছায়নি। এখানেই সরবরাহ ব্যবস্থাপনার সময় নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দেয়। কারণ মরক্কো থেকে জাহাজ লোড হয়ে বাংলাদেশে পৌঁছাতেই প্রায় দেড় মাস সময় লাগতে পারে। এরপর জাহাজ থেকে সার খালাসে প্রায় ২০ দিন, ব্যাগিংয়ে প্রায় এক মাস এবং পরিবহন ঠিকাদারের মাধ্যমে বিএডিসির গুদামে পৌঁছাতে আরও ৩ থেকে ৪ মাস পর্যন্ত সময় লাগার কথা বলা হচ্ছে। অর্থাৎ বিদেশে টেন্ডার আহ্বান বা জাহাজের জন্য চুক্তি করলেই পরদিন কৃষকের হাতে সার পৌঁছে যাচ্ছে না। কৃষিমন্ত্রীর হিসাবে বন্দরে বা জাহাজে পাইপলাইনে রয়েছে ৪ লাখ ৪২ হাজার ৮০০ টন সার। কিন্তু ‘পাইপলাইনে থাকা’ এবং ‘কৃষকের হাতে থাকা, দুটি বিষয় এক নয়। কৃষকের প্রয়োজনের সময় যদি সার ডিলার পয়েন্টে না থাকে, তাহলে সমুদ্রপথে আসন্ন চালান বা ভবিষ্যতের আমদানি দিয়ে তাৎক্ষণিক ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে আমন মৌসুমে নির্দিষ্ট সময়ে ইউরিয়া, ডিএপি, এমওপি বা অন্যান্য সারের প্রয়োজন হয়। কয়েক সপ্তাহ দেরি হলেও তার প্রভাব ফলনে পড়তে পারে। তাই সার ব্যবস্থাপনায় শুধু ‘কত টন আছে, এই প্রশ্নের পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত: কোথায় আছে? কত দিনে কৃষকের কাছে পৌঁছাবে? একদিকে সরকারি হিসাবে দেশে প্রায় ১৩ লাখ টন সার মজুত এবং আরও ৪ লাখ ৪২ হাজার ৮০০ টন পাইপলাইনে থাকার কথা বলা হচ্ছে। অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকরা সার না পাওয়ার অভিযোগে রাস্তায় নামছেন। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে কোথায় সমস্যা, সেটিই এখন খুঁজে বের করা জরুরি। সমস্যাটি মোট উৎপাদন বা জাতীয় পর্যায়ের মজুতে নাও হতে পারে। এটি হতে পারে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বণ্টন, ডিলারদের বরাদ্দ, পরিবহন, মজুত ব্যবস্থাপনা, সময়মতো আমদানি অথবা বাজার ব্যবস্থাপনার কোনো একটি স্তরে। তবে কৃষকের কাছে ফলাফল একটাই, প্রয়োজনের সময়ে সার না পাওয়া। সামনে রবি মৌসুম, উদ্বেগ আরও বাড়ছে আমন মৌসুমের পরপরই দেশে রবি মৌসুম শুরু হবে। এ সময়ে বোরোসহ বিভিন্ন ফসলের জন্য সারের চাহিদা বাড়বে। বর্তমান সরবরাহ ব্যবস্থায় যদি আমদানিকৃত সার দেশে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগে, এরপর খালাস, ব্যাগিং ও পরিবহনে আরও কয়েক মাস চলে যায়, তাহলে রবি মৌসুমের চাহিদা কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, এ প্রশ্ন এখনই সামনে আনা প্রয়োজন। কারণ সার সংকট দেখা দেওয়ার পর আমদানি শুরু করলে সমাধান পেতে সময় লাগবে। কৃষির ক্ষেত্রে সেই সময়টুকু সবসময় হাতে থাকে না। এখন দরকার স্বচ্ছ হিসাব সরকারের পক্ষ থেকে ‘সার সংকট নেই’ বলা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কৃষকের মাঠপর্যায়ের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন। প্রয়োজন জেলা ও উপজেলা ভিত্তিক সার মজুত, বরাদ্দ, বিক্রি ও চাহিদার প্রকাশ্য হিসাব। একই সঙ্গে গত বছরের প্রায় ৫৯ লাখ টন এবং চলতি বছরের ৪০ লাখ ২৯ হাজার টন চাহিদার মধ্যে পার্থক্যের কারণও স্পষ্ট করা দরকার। কারণ জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত সার থাকার পরও যদি কৃষককে ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে সড়ক অবরোধ করতে হয়, তাহলে সমস্যাটি শুধু ‘সার আছে কি নেই, এত সরল নয়। আসল প্রশ্ন হলো, সার আছে, কিন্তু কৃষকের হাতে আছে কি? কৃষকের জমিতে যখন সার প্রয়োগের সময় চলে যাচ্ছে, তখন গুদামের হিসাব নয়, মাঠে কৃষকের হাতে সার পৌঁছেছে কি না, সেটিই হওয়া উচিত সরবরাহ ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Design & Developed by : BD IT HOST